প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কাছে বাংলা প্রেস সম্পাদক ছাবেদ সাথীর খোলা চিঠি
দীর্ঘ প্রায় দুই দশক ধরে বন্ধ থাকা নিউইয়র্ক–ঢাকা রুটে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের নিয়মিত যাত্রীবাহী ফ্লাইট পুনরায় চালুর জন্য বাস্তবসম্মত ও সময়সীমাবদ্ধ রোডম্যাপ ঘোষণার দাবি জানিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী বাংলাদেশিরা। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে যোগ দিতে নি উইয়র্ক সফররত প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কাছে দেওয়া এক খোলা চিঠিতে এ দাবি তুলে ধরেছেন যুক্তরাষ্ট্রের বাংলা সংবাদমাধ্যম বাংলা প্রেসের সম্পাদক ছাবেদ সাথী।
খোলা চিঠিতে তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র থেকে বাংলাদেশে যাতায়াতের ক্ষেত্রে সরাসরি জাতীয় পতাকাবাহী ফ্লাইট না থাকায় প্রবাসীদের দীর্ঘদিন ধরে তৃতীয় দেশের বিমানবন্দর ব্যবহার করতে হচ্ছে। দোহা, দুবাই, ইস্তাম্বুলসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ট্রানজিট করে ঢাকায় পৌঁছাতে হয়। এতে বিশেষ করে বয়স্ক যাত্রী, অসুস্থ ব্যক্তি, হুইলচেয়ার ব্যবহারকারী এবং ছোট শিশুসহ পরিবারগুলোকে বাড়তি দুর্ভোগের মুখে পড়তে হয়।
চিঠিতে বলা হয়, দীর্ঘ যাত্রার পর বিমান পরিবর্তন, এক টার্মিনাল থেকে অন্য টার্মিনালে যাওয়া, পুনরায় নিরাপত্তা তল্লাশি, গেট পরিবর্তন, ফ্লাইট বিলম্ব, লাগেজ নিয়ে অনিশ্চয়তা এবং সংযোগকারী ফ্লাইট মিস হওয়ার আশঙ্কায় অনেক প্রবাসীর স্বদেশযাত্রার আনন্দ ভোগান্তিতে পরিণত হয়।
অন্যদিকে, জাতীয় পতাকাবাহী বিমানে দেশে ফেরার অভিজ্ঞতার সঙ্গে প্রবাসীদের আবেগের সম্পর্ক রয়েছে উল্লেখ করে ছাবেদ সাথী বলেন, বিমানে ওঠার পর বাংলায় ঘোষণা, বাংলাদেশি কেবিন ক্রুদের মাতৃভাষায় সেবা এবং পরিচিত খাবার একজন প্রবাসীকে যাত্রার শুরু থেকেই স্বদেশে ফেরার অনুভূতি দেয়।
২০০৬ সাল থেকে বন্ধ নিউইয়র্ক রুট
নিউ ইয়র্কে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের নিয়মিত ফ্লাইট ২০০৬ সালে বন্ধ হয়ে যায়। ১৯৯৩ সালে চালু হওয়া এ পরিষেবা শেষ পর্যায়ে ঢাকা–দুবাই–ব্রাসেলস–নিউইয়র্ক রুটে পরিচালিত হতো। ২০০৬ সালের ২৯ জুলাই শেষ নিয়মিত ফ্লাইট পরিচালনার পর রুটটি বন্ধ করা হয়। তৎকালীন প্রতিবেদনে আর্থিক লোকসান, পুরোনো উড়োজাহাজ ও বহরের সীমাবদ্ধতাকে এর অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছিল।
খোলা চিঠিতে বলা হয়, রুটটি বন্ধ হওয়ার পর প্রায় ২০ বছর পার হলেও নিউইয়র্কে বিমানের নিয়মিত যাত্রীবাহী ফ্লাইট আর চালু হয়নি।
এ সময় যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশি জনগোষ্ঠীর পরিধি উল্লেখযোগ্যভাবে বিস্তৃত হয়েছে। নিউইয়র্কের পাশাপাশি নিউ জার্সি, কানেকটিকাট, পেনসিলভানিয়া, ম্যাসাচুসেটস, মেরিল্যান্ড ও ভার্জিনিয়াসহ বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশির বসবাসের কারণে নিউইয়র্ক–ঢাকা বিমান যোগাযোগের বিষয়টি নতুন করে মূল্যায়নের দাবি রাখে বলে চিঠিতে উল্লেখ করা হয়।
২০২১ সালে জেএফকেতে এসেছিল বিমানের বিশেষ ফ্লাইট
২০২১ সালের সেপ্টেম্বরে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৭৬তম অধিবেশনে যোগ দিতে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে বহনকারী বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের একটি ভিভিআইপি চার্টার্ড ফ্লাইট নিউইয়র্কের জন এফ কেনেডি (জেএফকে) আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করে। দীর্ঘদিন পর নিউইয়র্কে বাংলাদেশের জাতীয় পতাকাবাহী উড়োজাহাজের উপস্থিতি প্রবাসীদের মধ্যে নিয়মিত ফ্লাইট পুনরায় চালুর আশা তৈরি করেছিল।
সে সময় তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেনও নিউইয়র্ক–ঢাকা রুটে আবার নিয়মিত বিমান চলাচলের সম্ভাবনার কথা বলেছিলেন। তবে পাঁচ বছর পরও সেই প্রত্যাশা বাস্তবায়িত হয়নি।
‘রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি নয়, চাই বাস্তব রোডম্যাপ’
খোলা চিঠিতে নিউ ইয়র্ক রুটের বিষয়টিকে কোনো একটি রাজনৈতিক দলের সাফল্য বা ব্যর্থতা হিসেবে না দেখে দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় স্বার্থের বিষয় হিসেবে বিবেচনার আহ্বান জানানো হয়েছে।
ছাবেদ সাথী বলেন, ২০০৬ সালে বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারের শেষ বছরে রুটটি বন্ধ হয়। পরবর্তী দীর্ঘ আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ও নিউইয়র্কে বিমানের নিয়মিত ফ্লাইট পুনরায় চালু করা সম্ভব হয়নি।
তিনি বলেন, ‘দুই দশকের অভিজ্ঞতা থেকে এখন প্রবাসীরা শুধু আরেকটি রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি চান না। আমরা জানতে চাই—কবে, কীভাবে এবং কোন কোন নিয়ন্ত্রক ও কারিগরি ধাপ অতিক্রম করে নিউইয়র্ক–ঢাকা রুটে বিমান ফিরবে।’
খোলা চিঠিতে বাংলাদেশের বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (সিএএবি), বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং সংশ্লিষ্ট মার্কিন কর্তৃপক্ষের মধ্যে সমন্বয়ের মাধ্যমে একটি প্রকাশ্য কর্মপরিকল্পনা তৈরির আহ্বান জানানো হয়।
এতে মার্কিন ফেডারেল এভিয়েশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশন-এর প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা মান অর্জন, আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা অডিট, উড়োজাহাজ ও ক্রু সক্ষমতা, সম্ভাব্য রুট, সাপ্তাহিক ফ্লাইটের সংখ্যা এবং বাণিজ্যিক সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
‘প্রবাসীরা শুধু যাত্রী নন’
খোলা চিঠিতে বলা হয়, প্রবাসী বাংলাদেশিরা শুধু বিমানের যাত্রী নন; তাঁরা বাংলাদেশের অর্থনীতিরও গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। দেশে অর্থ পাঠানো, বিনিয়োগ, পরিবারের ব্যয় বহন, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং বিদেশে বাংলাদেশের পরিচিতি তৈরিতে তাঁদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।
তাই নিউইয়র্কে বাংলাদেশের জাতীয় পতাকাবাহী এয়ারলাইন্সের সংযোগকে শুধু পরিবহন সুবিধা হিসেবে না দেখে অর্থনীতি, পর্যটন, প্রবাসী সম্পর্ক ও আন্তর্জাতিক যোগাযোগের অংশ হিসেবে বিবেচনা করা উচিত বলে চিঠিতে উল্লেখ করা হয়।
একই সঙ্গে আবেগের ভিত্তিতে লোকসানি রুট পরিচালনার পরিবর্তে নতুন উদ্যোগকে নিরাপদ, নিয়ন্ত্রকভাবে অনুমোদিত এবং দীর্ঘমেয়াদে আর্থিকভাবে টেকসই করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
জেএফকেতে আবার লাল-সবুজের বিমান দেখার প্রত্যাশা
প্রধানমন্ত্রীর উদ্দেশে খোলা চিঠির শেষাংশে ছাবেদ সাথী বলেন, যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসীরা এমন একটি দিন দেখতে চান, যখন নিউইয়র্কের জেএফকে আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের ডিপারচার বোর্ডে আবারও দেখা যাবে—’বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স: নিউইয়র্ক-ঢাকা’।
তিনি বলেন, সরাসরি বিমান যোগাযোগ চালু হলে বয়স্ক বাবা-মা ও ছোট শিশুসহ পরিবারগুলোকে তৃতীয় দেশের বিমানবন্দরে দীর্ঘ ট্রানজিটের দুর্ভোগ থেকে অনেকটাই মুক্ত করা সম্ভব হবে।
প্রধানমন্ত্রীর নিউ ইয়র্ক সফরের সময় প্রবাসীদের দীর্ঘদিনের এ দাবিকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে অবিলম্বে ফ্লাইট চালুর অবাস্তব প্রতিশ্রুতির পরিবর্তে নিউইয়র্ক–ঢাকা রুটে বিমান পুনঃচালুর একটি বিশ্বাসযোগ্য ও সময়সীমাবদ্ধ রোডম্যাপ ঘোষণার আহ্বান জানানো হয়।
‘প্রায় বিশ বছরের অপেক্ষার পর প্রবাসীরা অন্তত জানতে চান—কবে এবং কোন পথে নিউইয়র্কে আবার ফিরবে বাংলাদেশের জাতীয় পতাকাবাহী বিমান,’—খোলা চিঠিতে বলেন বাংলা প্রেস সম্পাদক ছাবেদ সাথী।






















