০১:০৬ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ০৪ নভেম্বর ২০২৬

দুমকিতে টিআর-কাবিখার প্রকল্পে হরিলুট, সরেজমিনে অনিয়ম ও দুর্নীতির প্রমাণ পেল দুদক

ইউসুফ (সজিব) প্টুয়াখালি জেলা প্রতিনিধি:- পটুয়াখালীর দুমকি উপজেলায় ২০২৪-২৫ ও ২০২৫-২৬ অর্থবছরে কাবিখা (কাজের বিনিময়ে খাদ্য) এবং টিআর (টেস্ট রিলিফ) প্রকল্পের অধীন বাস্তবায়িত বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কাজে ব্যাপক অনিয়ম, ভুয়া প্রকল্প দেখিয়ে অর্থ আত্মসাৎ ও দুর্নীতির চাঞ্চল্যকর তথ্য উদ্ঘাটন করেছে প্রধান কার্যালয়ের অনুমোদনপ্রাপ্ত একটি বিশেষ তদন্ত দল। উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় দিনব্যাপী আকস্মিক অভিযান চালিয়ে প্রকল্প বাস্তবায়নে বড় ধরনের অনিয়ম ও দুর্নীতির সত্যতা পায় তদন্ত টিম দুদক।

যেসব অনিয়ম ও দুর্নীতির চিত্র উঠে এসেছে:

* র‌্যাম্প নির্মাণে ভুয়া কাজ: উপজেলা পরিষদের গাড়ি ধৌত করার র‌্যাম্পের সামনের স্থানে মাটি ভরাট ও ইট সোলিংকরণের কথা থাকলেও বাস্তবে কোনো মাটি ভরাটের কাজ করা হয়নি; কেবল নামমাত্র ৮২৫টি ইট ব্যবহার দেখানো হয়েছে, যার বিপরীতে বরাদ্দ ছিল ২ লক্ষ ৩শ ৭৪ টাকা। অথচ এর ব্যয় বরাদ্দ ছিল ২ লক্ষ টাকা।
* ফুলবাগানে মাটি ভরাটের অস্তিত্ব নেই: উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মহোদয়ের বাসভবনের ফুলবাগান এবং পরিষদের মাঠে মাটি ভরাটের কোনো অস্তিত্বই পায়নি তদন্ত দল।
* অস্তিত্বহীন গভীর নলকূপ ও রাস্তা: শ্রীরামপুর ইউনিয়নের ৩ নম্বর ওয়ার্ডে কুলসুম বেগমের বাড়ির আঙিনায় গভীর নলকূপ স্থাপন এবং চরবয়রা রাজীবেরি থেকে কুইজঘাট পর্যন্ত রাস্তা মেরামতের কোনো অস্তিত্বই পাওয়া যায়নি। এমনকি সংশ্লিষ্ট প্রকল্পের সভাপতির দাবি, তিনি এ কাজ সম্পর্কে কিছুই জানেন না।
* পুরোনো রাস্তা নতুন দেখিয়ে অর্থ উত্তোলন: লেবুখালী ইউনিয়নের মকবুল শরিফ থেকে সিদ্দিক শরিফের দোকান পর্যন্ত রাস্তা সংস্কারে ৩ লক্ষ টাকা বরাদ্দ থাকলেও সেখানে প্রায় ১০ বছর আগের পুরনো রাস্তায় কাজ করা হয়েছে বলে প্রমাণ মিলেছে। এছাড়া মহাসড়ক হতে শরিফ বাড়ি পর্যন্ত রাস্তার দুই পাশে মাটি ভরাটের কোনো কাজই হয়নি, বরং ওই স্থানে এলজিইডির কার্পেটিংয়ের কাজ চলমান রয়েছে।
* সিসি ক্যামেরা বরাদ্দে ভুয়া তথ্য: ৫টি নির্বাচন কেন্দ্রে সিসি ক্যামেরা স্থাপনের জন্য ১ লক্ষ ৪০ হাজার টাকা বরাদ্দ দেওয়া হলেও সংশ্লিষ্ট ৫ জন ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যানের সাথে কথা বলে জানা যায়, তারা এ বিষয়ে কিছুই জানেন না এবং কোনো বরাদ্দ পাননি।
* বিদ্যালয়ের মাঠ ভরাটেও নয়ছয়: সাতানী আমিনুদ্দিন মাধ্যমিক বিদ্যালয় এবং কার্তিকপাশা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের মাঠে কাজ নামমাত্র হলেও প্রকল্প দেখিয়ে লক্ষাধিক টাকা আত্মসাতের প্রাথমিক প্রমাণ মিলেছে।

প্রকল্প ছোট হলেও দুর্নীতি অনেক বড়: তদন্ত দল
তদন্ত সংশ্লিষ্টরা জানান, টিআর ও কাবিখার প্রকল্পগুলো আকারে ছোট এবং বরাদ্দ কম মনে হলেও সামগ্রিকভাবে এর দুর্নীতির পরিধি ও ভলিউম অনেক বড়। অনেক ক্ষেত্রে প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটির সভাপতি বা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা নিজের নামে প্রকল্প ও টাকা উত্তোলনের বিষয়টি জানলেও অনেকেই সম্পূর্ণ অন্ধকারে রয়েছেন।

এ বিষয়ে দুদক এর পটুয়াখালী সমন্বিত জেলা কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক মো:তাপস বিশ্বাস সংবাদ সংযোগ কে জানিয়েছে, যেহেতু প্রকল্পগুলোর বাস্তবায়ন ও দেখভালের দায়িত্বে পিআইও (প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা) এবং সংশ্লিষ্ট সভাপতিরা রয়েছেন, তাই পারস্পরিক যোগসাজশেই এই দুর্নীতি সংঘটিত হয়েছে। তদন্ত শেষে প্রধান কার্যালয়ে পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন দাখিল করা হবে এবং নির্দেশনার আলোকে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

Please Share This Post in Your Social Media

আপডেট: ১১:৩৭:৫৭ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৩ নভেম্বর ২০২৬
০

দুমকিতে টিআর-কাবিখার প্রকল্পে হরিলুট, সরেজমিনে অনিয়ম ও দুর্নীতির প্রমাণ পেল দুদক

আপডেট: ১১:৩৭:৫৭ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৩ নভেম্বর ২০২৬

ইউসুফ (সজিব) প্টুয়াখালি জেলা প্রতিনিধি:- পটুয়াখালীর দুমকি উপজেলায় ২০২৪-২৫ ও ২০২৫-২৬ অর্থবছরে কাবিখা (কাজের বিনিময়ে খাদ্য) এবং টিআর (টেস্ট রিলিফ) প্রকল্পের অধীন বাস্তবায়িত বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কাজে ব্যাপক অনিয়ম, ভুয়া প্রকল্প দেখিয়ে অর্থ আত্মসাৎ ও দুর্নীতির চাঞ্চল্যকর তথ্য উদ্ঘাটন করেছে প্রধান কার্যালয়ের অনুমোদনপ্রাপ্ত একটি বিশেষ তদন্ত দল। উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় দিনব্যাপী আকস্মিক অভিযান চালিয়ে প্রকল্প বাস্তবায়নে বড় ধরনের অনিয়ম ও দুর্নীতির সত্যতা পায় তদন্ত টিম দুদক।

যেসব অনিয়ম ও দুর্নীতির চিত্র উঠে এসেছে:

* র‌্যাম্প নির্মাণে ভুয়া কাজ: উপজেলা পরিষদের গাড়ি ধৌত করার র‌্যাম্পের সামনের স্থানে মাটি ভরাট ও ইট সোলিংকরণের কথা থাকলেও বাস্তবে কোনো মাটি ভরাটের কাজ করা হয়নি; কেবল নামমাত্র ৮২৫টি ইট ব্যবহার দেখানো হয়েছে, যার বিপরীতে বরাদ্দ ছিল ২ লক্ষ ৩শ ৭৪ টাকা। অথচ এর ব্যয় বরাদ্দ ছিল ২ লক্ষ টাকা।
* ফুলবাগানে মাটি ভরাটের অস্তিত্ব নেই: উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মহোদয়ের বাসভবনের ফুলবাগান এবং পরিষদের মাঠে মাটি ভরাটের কোনো অস্তিত্বই পায়নি তদন্ত দল।
* অস্তিত্বহীন গভীর নলকূপ ও রাস্তা: শ্রীরামপুর ইউনিয়নের ৩ নম্বর ওয়ার্ডে কুলসুম বেগমের বাড়ির আঙিনায় গভীর নলকূপ স্থাপন এবং চরবয়রা রাজীবেরি থেকে কুইজঘাট পর্যন্ত রাস্তা মেরামতের কোনো অস্তিত্বই পাওয়া যায়নি। এমনকি সংশ্লিষ্ট প্রকল্পের সভাপতির দাবি, তিনি এ কাজ সম্পর্কে কিছুই জানেন না।
* পুরোনো রাস্তা নতুন দেখিয়ে অর্থ উত্তোলন: লেবুখালী ইউনিয়নের মকবুল শরিফ থেকে সিদ্দিক শরিফের দোকান পর্যন্ত রাস্তা সংস্কারে ৩ লক্ষ টাকা বরাদ্দ থাকলেও সেখানে প্রায় ১০ বছর আগের পুরনো রাস্তায় কাজ করা হয়েছে বলে প্রমাণ মিলেছে। এছাড়া মহাসড়ক হতে শরিফ বাড়ি পর্যন্ত রাস্তার দুই পাশে মাটি ভরাটের কোনো কাজই হয়নি, বরং ওই স্থানে এলজিইডির কার্পেটিংয়ের কাজ চলমান রয়েছে।
* সিসি ক্যামেরা বরাদ্দে ভুয়া তথ্য: ৫টি নির্বাচন কেন্দ্রে সিসি ক্যামেরা স্থাপনের জন্য ১ লক্ষ ৪০ হাজার টাকা বরাদ্দ দেওয়া হলেও সংশ্লিষ্ট ৫ জন ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যানের সাথে কথা বলে জানা যায়, তারা এ বিষয়ে কিছুই জানেন না এবং কোনো বরাদ্দ পাননি।
* বিদ্যালয়ের মাঠ ভরাটেও নয়ছয়: সাতানী আমিনুদ্দিন মাধ্যমিক বিদ্যালয় এবং কার্তিকপাশা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের মাঠে কাজ নামমাত্র হলেও প্রকল্প দেখিয়ে লক্ষাধিক টাকা আত্মসাতের প্রাথমিক প্রমাণ মিলেছে।

প্রকল্প ছোট হলেও দুর্নীতি অনেক বড়: তদন্ত দল
তদন্ত সংশ্লিষ্টরা জানান, টিআর ও কাবিখার প্রকল্পগুলো আকারে ছোট এবং বরাদ্দ কম মনে হলেও সামগ্রিকভাবে এর দুর্নীতির পরিধি ও ভলিউম অনেক বড়। অনেক ক্ষেত্রে প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটির সভাপতি বা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা নিজের নামে প্রকল্প ও টাকা উত্তোলনের বিষয়টি জানলেও অনেকেই সম্পূর্ণ অন্ধকারে রয়েছেন।

এ বিষয়ে দুদক এর পটুয়াখালী সমন্বিত জেলা কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক মো:তাপস বিশ্বাস সংবাদ সংযোগ কে জানিয়েছে, যেহেতু প্রকল্পগুলোর বাস্তবায়ন ও দেখভালের দায়িত্বে পিআইও (প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা) এবং সংশ্লিষ্ট সভাপতিরা রয়েছেন, তাই পারস্পরিক যোগসাজশেই এই দুর্নীতি সংঘটিত হয়েছে। তদন্ত শেষে প্রধান কার্যালয়ে পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন দাখিল করা হবে এবং নির্দেশনার আলোকে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হবে।