০২:১০ অপরাহ্ন, বুধবার, ২৮ অক্টোবর ২০২৬

লাতিন আমেরিকায় ট্রাম্পের আধিপত্যের স্বপ্নে ধাক্কা

ব্রাজিলের বামপন্থী প্রেসিডেন্ট লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভার নির্বাচনী প্রত্যাবর্তন লাতিন আমেরিকায় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রভাব বিস্তারের উচ্চাকাঙ্ক্ষায় নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে।

ওয়াশিংটনের চাপ ও হস্তক্ষেপের অভিযোগের মুখেও ব্রাজিলের সার্বভৌমত্ব রক্ষার প্রশ্নে লুলার অনড় অবস্থান তাকে রাজনৈতিক সুবিধা এনে দিয়েছে।

অন্যদিকে, লাতিন আমেরিকার একাধিক দেশে ডানপন্থী ও ট্রাম্পঘনিষ্ঠ নেতাদের উত্থানের মধ্যেও ব্রাজিলে লুলার জয় যুক্তরাষ্ট্রের আঞ্চলিক আধিপত্য প্রতিষ্ঠার কৌশলকে জটিল করে তুলেছে।

নির্বাচনে জয়ের পর দেওয়া ভাষণে লুলা বলেন, “ব্রাজিল কারও পেছনের উঠান হয়ে থাকা মেনে নেবে না।”

তার এ বক্তব্যের লক্ষ্য ছিল স্পষ্টতই ওয়াশিংটন। যদিও সাধারণত পররাষ্ট্রনীতি কোনও নির্বাচনে জয়-পরাজয়ের প্রধান নির্ধারক হয় না, ব্রাজিলের ক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম ঘটেনি। তবে ব্রাজিলের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে মার্কিন হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে লুলার অবস্থান ভোটারদের মধ্যে দেশপ্রেমের অনুভূতি জাগিয়ে তুলতে ভূমিকা রেখেছে।

সাবেক শ্রমিকনেতা লুলার রাজনীতির অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো ক্ষমতাধর ব্যক্তি ও শক্তির বিরুদ্ধে দাঁড়ানো। যুক্তরাষ্ট্রের চাপের মুখে তার দৃঢ় অবস্থান সেই রাজনৈতিক ভাবমূর্তির সঙ্গেও সামঞ্জস্যপূর্ণ।

বিস্ময়করভাবে, এই দৃঢ়তা ট্রাম্পের কাছেও লুলার প্রতি একধরনের সম্মান তৈরি করেছে বলে মনে হচ্ছে। নির্বাচনের ফল নিয়ে প্রতিক্রিয়া জানাতে গিয়ে ট্রাম্প বলেন, “আমি লুলাকে পছন্দ করি, আমাদের মধ্যে সম্পর্ক ভালো।”

তিনি আরও বলেন, “আমি কোনও পক্ষ নিইনি।” তবে একই সঙ্গে তিনি নির্বাচনকে ‘ভয়াবহ’ ও ‘কারচুপিপূর্ণ’ বলে মন্তব্য করেন।

ট্রাম্পের বক্তব্যে এই দ্বৈত অবস্থান দুই নেতার সম্পর্কের জটিলতাই তুলে ধরে। ট্রাম্প সরাসরি লুলার প্রতিদ্বন্দ্বী ফ্লাভিও বলসোনারোর প্রতি সমর্থন ঘোষণা করেননি। তবে ফ্লাভিওর বাবা, ব্রাজিলের সাবেক প্রেসিডেন্ট জইর বলসোনারোর সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক সম্পর্ক ছিল। ফ্লাভিও নিজেও নির্বাচনের ফল মেনে নিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন।

শুল্ক আরোপের বিরুদ্ধে লুলার পাল্টা অবস্থান
প্রায় এক বছর আগে লুলার সঙ্গে তার বাসভবনে কথা বলার সময় দুই দেশের সম্পর্ক ছিল তলানিতে। তখন লুলা জানিয়েছিলেন, ট্রাম্পের সঙ্গে তার কোনও সম্পর্ক নেই, তাদের কখনও কথা হয়নি এবং তিনি নিজে থেকে ফোন করারও কোনও পরিকল্পনা করছেন না।

এর আগে ব্রাজিলের ওপর কঠোর শুল্ক আরোপ করেছিলেন ট্রাম্প। এর পেছনে মূলত রাজনৈতিক কারণ ছিল বলে মনে করা হয়। জইর বলসোনারোর বিরুদ্ধে অভ্যুত্থানচেষ্টার মামলাকে ট্রাম্প ‘রাজনৈতিক প্রতিহিংসা’ হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন। সেই মামলাকে কেন্দ্র করেই ব্রাজিলের ওপর শাস্তিমূলক শুল্ক আরোপ করা হয়।

যুক্তরাষ্ট্রের কয়েকটি মিত্রদেশ ট্রাম্পের সঙ্গে বিরোধ এড়িয়ে চলার চেষ্টা করলেও লুলা পাল্টা অবস্থান নেন। তিনি ব্রাজিলের সার্বভৌমত্বের পক্ষে জোরালো বক্তব্য দেন, বিচারিক প্রক্রিয়ায় মার্কিন হস্তক্ষেপের সমালোচনা করেন এবং ‘ব্রাজিল ব্রাজিলীয়দের’-এমন বার্তা লেখা নীল টুপি পরেও প্রচারে অংশ নেন।

এতে তার জনসমর্থন বেড়ে যায়। শুল্ক আরোপের পক্ষে তদবির করা বলসোনারো পরিবারকে তিনি দেশপ্রেমহীন বলেও অভিযুক্ত করেন। দেশপ্রেমের প্রশ্নে সাধারণত নিজেদের শক্তিশালী অবস্থান দাবি করা ব্রাজিলের ডানপন্থীদের জন্য এটি ছিল রাজনৈতিকভাবে অস্বস্তিকর।

এমনকি দেশটির কৃষি খাতের কিছু প্রভাবশালী গোষ্ঠীও লুলার বক্তব্যের যৌক্তিকতা স্বীকার করে। এসব গোষ্ঠীর অনেকেই বলসোনারোর সমর্থক হলেও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যের ওপর নির্ভরশীল।

একপর্যায়ে যুক্তরাষ্ট্র শুল্ক কমিয়ে পিছু হটে। যদিও পরে শুল্ক আবার বাড়ানো হয়েছে। তবে এর মধ্যে দুই দেশের সম্পর্কের বরফ গলতে শুরু করে।

জাতিসংঘে দুই নেতার কথা হয়। পরে হোয়াইট হাউসের ওভাল অফিসে তাদের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। ট্রাম্প বৈঠকটিকে ‘খুব ভালো’ বলে বর্ণনা করেন। আর লুলা জানান, তিনি বৈঠক শেষে ‘খুব সন্তুষ্ট’।

এ ঘটনা থেকে ধারণা করা হয়, দৃঢ় অবস্থান নেওয়া নেতাদের প্রতি ট্রাম্পের একধরনের শ্রদ্ধা থাকতে পারে।

 

লাতিন আমেরিকায় আধিপত্য বিস্তারের পরিকল্পনা

তাহলে লুলার জয়ে ট্রাম্প অসন্তুষ্ট হওয়ার কারণ কী?
সাম্প্রতিক সময়ে লাতিন আমেরিকার রাজনীতিতে ডানপন্থীদের প্রভাব বেড়েছে। ইকুয়েডর, চিলি, কলম্বিয়া, আর্জেন্টিনা ও পেরুর মতো দেশে ট্রাম্প প্রশাসনের ঘনিষ্ঠ একাধিক নেতা ক্ষমতায় এসেছেন। এই মিত্রদের কাজে লাগিয়ে পশ্চিম গোলার্ধে যুক্তরাষ্ট্রের আধিপত্য প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছেন ট্রাম্প। তার প্রশাসন এ কৌশলকে ‘ডনরো ডকট্রিন’ নামে অভিহিত করেছে।

লাতিন আমেরিকাবিষয়ক গবেষণাপ্রতিষ্ঠান চ্যাথাম হাউসের জ্যেষ্ঠ গবেষক ক্রিস্টোফার সাবাতিনি মনে করেন, প্রথম দফার নির্বাচনে ফ্লাভিও বলসোনারো এগিয়ে যাওয়ার পর ট্রাম্প ভেবেছিলেন, ব্রাজিল হবে তার জন্য ‘দশম ও সবচেয়ে বড় পুরস্কার’।

ব্রাজিল লাতিন আমেরিকার বৃহত্তম অর্থনীতি। ট্রাম্পের ‘শিল্ড অব আমেরিকাস’ জোটে যোগ দিয়ে মাদক পাচারবিরোধী উদ্যোগে অংশ নেবেন- ফ্লাভিও বলসোনারোর ক্ষেত্রে এমন প্রত্যাশাও ছিল।

এছাড়া বিরল মৃত্তিকা খনিজের মজুতের দিক থেকে চীনের পরই বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম মজুত রয়েছে ব্রাজিলে। এসব গুরুত্বপূর্ণ খনিজে অগ্রাধিকারভিত্তিক প্রবেশাধিকার পাওয়ার বিষয়েও যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রহ ছিল।

লুলার জয়ে সেই পরিকল্পনা বাধাগ্রস্ত হয়েছে। তার সামনে এখন আরও চার বছরের মেয়াদ থাকায় ব্রাজিলের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কের ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে হিসাব করতে হবে ওয়াশিংটনকে।

নির্বাচনী ব্যবস্থা ও সামরিক হস্তক্ষেপ নিয়ে বিরোধ
সম্পর্কের উন্নতি হলেও দুই দেশের মধ্যে বিরোধের একাধিক ক্ষেত্র রয়ে গেছে।

চলতি বছরের শুরুতে ব্রাজিল অভিযোগ করে, যুক্তরাষ্ট্র দেশটির নির্বাচনী ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে সন্দেহ তৈরির চেষ্টা করছে। এ ঘটনায় সফরের পরিকল্পনা করা মার্কিন পররাষ্ট্র দফতরের দুই কর্মকর্তাকে ভিসা দিতে অস্বীকৃতি জানায় ব্রাজিল। পাল্টা পদক্ষেপ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র ব্রাজিলের রাষ্ট্রদূতের ভিসা বাতিল করে। ওয়াশিংটন ব্রাজিলের অভিযোগকে ‘ভিত্তিহীন’ বলে প্রত্যাখ্যান করে।

ট্রাম্প যদি ব্রাজিলের নির্বাচনের ফলকে বারবার ‘কারচুপিপূর্ণ’ বলে অভিহিত করতে থাকেন, তাহলে দুই দেশের মধ্যে নতুন করে কূটনৈতিক বিরোধ দেখা দিতে পারে।

এছাড়া লাতিন আমেরিকায় মার্কিন সামরিক পদক্ষেপেরও বিরোধিতা করে আসছেন লুলা। ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে আটক করা থেকে শুরু করে মাদক পাচারের অভিযোগে সন্দেহভাজন নৌযানে বোমা হামলা- এসব পদক্ষেপের সমালোচনা করেছেন তিনি।

ফ্লাভিও বলসোনারোর তদবিরের পর যুক্তরাষ্ট্র ব্রাজিলের দুটি প্রধান অপরাধী চক্রকে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে চিহ্নিত করায়ও ক্ষোভ প্রকাশ করেন লুলা। তার আশঙ্কা, এ ধরনের পদক্ষেপ ব্রাজিলের সার্বভৌমত্বের জন্য হুমকি তৈরি করতে পারে।

লাতিন আমেরিকার বামপন্থী রাজনীতির কাছে বিষয়টি বিশেষভাবে সংবেদনশীল। কারণ, বিংশ শতাব্দীতে এ অঞ্চলে সংঘটিত একাধিক নৃশংস সামরিক স্বৈরশাসনের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএর সংশ্লিষ্টতার ইতিহাস রয়েছে। কমিউনিজম ঠেকানোর যুক্তিতে এসব শাসনকে বিভিন্ন সময়ে সমর্থন দিয়েছিল ওয়াশিংটন।

প্রযুক্তি ও ডিজিটাল অর্থনীতিতেও টানাপোড়েন
যুক্তরাষ্ট্র-ব্রাজিল সম্পর্কে নতুন বিরোধের ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে প্রযুক্তি খাতও।

লুলার নির্বাচনী প্রচারশিবির অভিযোগ করেছিল, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম প্রতিষ্ঠান মেটা ফ্লাভিও বলসোনারোর প্রতি পক্ষপাত দেখাচ্ছে। মেটা এ অভিযোগ অস্বীকার করলেও স্বীকার করে, কনটেন্ট নিয়ন্ত্রণে কিছু সমস্যা ও প্রযুক্তিগত ত্রুটির কারণে কয়েকটি পোস্ট ভুলবশত সরিয়ে ফেলা হয়েছিল কিংবা সেগুলোর প্রচার সীমিত হয়ে পড়েছিল।

এর জবাবে লুলার সমর্থকেরা অ্যালগরিদমের প্রভাব এড়িয়ে তার বার্তা ছড়িয়ে দিতে প্রায় এক কোটি সদস্যের হোয়াটসঅ্যাপ গোষ্ঠী ব্যবহার করেন।

অন্যদিকে, ব্রাজিলের তাৎক্ষণিক অর্থ লেনদেনব্যবস্থা ‘পিক্স’ নিয়েও অসন্তুষ্ট ট্রাম্প প্রশাসন। দেশটির অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা এই ব্যবস্থা দ্রুত ও সহজে অর্থ স্থানান্তরের সুযোগ দেয়। তবে যুক্তরাষ্ট্রের দৃষ্টিতে, পিক্সের বিস্তার ভিসা ও মাস্টারকার্ডের মতো মার্কিন পেমেন্ট প্রতিষ্ঠানের ব্যবসায় প্রতিযোগিতামূলক চাপ তৈরি করছে।

নির্বাচনী প্রচারেও দুই পক্ষের রাজনৈতিক বিভাজন স্পষ্ট হয়ে ওঠে। বলসোনারোর সমর্থকদের সমাবেশে যুক্তরাষ্ট্রের পতাকা ওড়ানো হয়। এমনকি এক সমাবেশে ‘ট্রাম্প, ব্রাজিলে পারমাণবিক হামলা চালাও’ লেখা একটি বেলুনও দেখা যায়। বিপরীতে, লুলা ও তার সমর্থকেরা অভিযোগ করেন, ফ্লাভিও বলসোনারো ব্রাজিলের স্বার্থের চেয়ে যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন।

বাণিজ্যিক সম্পর্কের গুরুত্বও কম নয়
তবে দুই দেশের সম্পর্কের উত্তেজনাকে অতিরঞ্জিত করার সুযোগও রয়েছে। চীনের পর যুক্তরাষ্ট্রই ব্রাজিলের দ্বিতীয় বৃহত্তম বাণিজ্য অংশীদার। ফলে রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকলেও দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্কের গুরুত্ব অস্বীকার করার উপায় নেই।

আপাতত ট্রাম্প ও লুলার মধ্যে কাজ চালিয়ে নেওয়ার মতো সম্পর্ক রয়েছে। তবে তা কত দিন স্থায়ী হবে, তা নির্ভর করবে ব্রাজিলের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র কতটা হস্তক্ষেপের চেষ্টা করে এবং তার জবাবে লুলা কতটা দৃঢ় অবস্থান নেন, তার ওপর।

ব্রাজিলে লুলার প্রত্যাবর্তন তাই শুধু দেশটির অভ্যন্তরীণ রাজনীতির ঘটনা নয়; এটি লাতিন আমেরিকায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব বিস্তারের কৌশল এবং আঞ্চলিক দেশগুলোর সার্বভৌমত্ব রক্ষার আকাঙ্ক্ষার মধ্যকার টানাপোড়েনকেও সামনে এনেছে। সূত্র: বিবিসি

Please Share This Post in Your Social Media

আপডেট: ০৬:১৯:৩২ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর ২০২৬
১

লাতিন আমেরিকায় ট্রাম্পের আধিপত্যের স্বপ্নে ধাক্কা

আপডেট: ০৬:১৯:৩২ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর ২০২৬

ব্রাজিলের বামপন্থী প্রেসিডেন্ট লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভার নির্বাচনী প্রত্যাবর্তন লাতিন আমেরিকায় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রভাব বিস্তারের উচ্চাকাঙ্ক্ষায় নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে।

ওয়াশিংটনের চাপ ও হস্তক্ষেপের অভিযোগের মুখেও ব্রাজিলের সার্বভৌমত্ব রক্ষার প্রশ্নে লুলার অনড় অবস্থান তাকে রাজনৈতিক সুবিধা এনে দিয়েছে।

অন্যদিকে, লাতিন আমেরিকার একাধিক দেশে ডানপন্থী ও ট্রাম্পঘনিষ্ঠ নেতাদের উত্থানের মধ্যেও ব্রাজিলে লুলার জয় যুক্তরাষ্ট্রের আঞ্চলিক আধিপত্য প্রতিষ্ঠার কৌশলকে জটিল করে তুলেছে।

নির্বাচনে জয়ের পর দেওয়া ভাষণে লুলা বলেন, “ব্রাজিল কারও পেছনের উঠান হয়ে থাকা মেনে নেবে না।”

তার এ বক্তব্যের লক্ষ্য ছিল স্পষ্টতই ওয়াশিংটন। যদিও সাধারণত পররাষ্ট্রনীতি কোনও নির্বাচনে জয়-পরাজয়ের প্রধান নির্ধারক হয় না, ব্রাজিলের ক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম ঘটেনি। তবে ব্রাজিলের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে মার্কিন হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে লুলার অবস্থান ভোটারদের মধ্যে দেশপ্রেমের অনুভূতি জাগিয়ে তুলতে ভূমিকা রেখেছে।

সাবেক শ্রমিকনেতা লুলার রাজনীতির অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো ক্ষমতাধর ব্যক্তি ও শক্তির বিরুদ্ধে দাঁড়ানো। যুক্তরাষ্ট্রের চাপের মুখে তার দৃঢ় অবস্থান সেই রাজনৈতিক ভাবমূর্তির সঙ্গেও সামঞ্জস্যপূর্ণ।

বিস্ময়করভাবে, এই দৃঢ়তা ট্রাম্পের কাছেও লুলার প্রতি একধরনের সম্মান তৈরি করেছে বলে মনে হচ্ছে। নির্বাচনের ফল নিয়ে প্রতিক্রিয়া জানাতে গিয়ে ট্রাম্প বলেন, “আমি লুলাকে পছন্দ করি, আমাদের মধ্যে সম্পর্ক ভালো।”

তিনি আরও বলেন, “আমি কোনও পক্ষ নিইনি।” তবে একই সঙ্গে তিনি নির্বাচনকে ‘ভয়াবহ’ ও ‘কারচুপিপূর্ণ’ বলে মন্তব্য করেন।

ট্রাম্পের বক্তব্যে এই দ্বৈত অবস্থান দুই নেতার সম্পর্কের জটিলতাই তুলে ধরে। ট্রাম্প সরাসরি লুলার প্রতিদ্বন্দ্বী ফ্লাভিও বলসোনারোর প্রতি সমর্থন ঘোষণা করেননি। তবে ফ্লাভিওর বাবা, ব্রাজিলের সাবেক প্রেসিডেন্ট জইর বলসোনারোর সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক সম্পর্ক ছিল। ফ্লাভিও নিজেও নির্বাচনের ফল মেনে নিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন।

শুল্ক আরোপের বিরুদ্ধে লুলার পাল্টা অবস্থান
প্রায় এক বছর আগে লুলার সঙ্গে তার বাসভবনে কথা বলার সময় দুই দেশের সম্পর্ক ছিল তলানিতে। তখন লুলা জানিয়েছিলেন, ট্রাম্পের সঙ্গে তার কোনও সম্পর্ক নেই, তাদের কখনও কথা হয়নি এবং তিনি নিজে থেকে ফোন করারও কোনও পরিকল্পনা করছেন না।

এর আগে ব্রাজিলের ওপর কঠোর শুল্ক আরোপ করেছিলেন ট্রাম্প। এর পেছনে মূলত রাজনৈতিক কারণ ছিল বলে মনে করা হয়। জইর বলসোনারোর বিরুদ্ধে অভ্যুত্থানচেষ্টার মামলাকে ট্রাম্প ‘রাজনৈতিক প্রতিহিংসা’ হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন। সেই মামলাকে কেন্দ্র করেই ব্রাজিলের ওপর শাস্তিমূলক শুল্ক আরোপ করা হয়।

যুক্তরাষ্ট্রের কয়েকটি মিত্রদেশ ট্রাম্পের সঙ্গে বিরোধ এড়িয়ে চলার চেষ্টা করলেও লুলা পাল্টা অবস্থান নেন। তিনি ব্রাজিলের সার্বভৌমত্বের পক্ষে জোরালো বক্তব্য দেন, বিচারিক প্রক্রিয়ায় মার্কিন হস্তক্ষেপের সমালোচনা করেন এবং ‘ব্রাজিল ব্রাজিলীয়দের’-এমন বার্তা লেখা নীল টুপি পরেও প্রচারে অংশ নেন।

এতে তার জনসমর্থন বেড়ে যায়। শুল্ক আরোপের পক্ষে তদবির করা বলসোনারো পরিবারকে তিনি দেশপ্রেমহীন বলেও অভিযুক্ত করেন। দেশপ্রেমের প্রশ্নে সাধারণত নিজেদের শক্তিশালী অবস্থান দাবি করা ব্রাজিলের ডানপন্থীদের জন্য এটি ছিল রাজনৈতিকভাবে অস্বস্তিকর।

এমনকি দেশটির কৃষি খাতের কিছু প্রভাবশালী গোষ্ঠীও লুলার বক্তব্যের যৌক্তিকতা স্বীকার করে। এসব গোষ্ঠীর অনেকেই বলসোনারোর সমর্থক হলেও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যের ওপর নির্ভরশীল।

একপর্যায়ে যুক্তরাষ্ট্র শুল্ক কমিয়ে পিছু হটে। যদিও পরে শুল্ক আবার বাড়ানো হয়েছে। তবে এর মধ্যে দুই দেশের সম্পর্কের বরফ গলতে শুরু করে।

জাতিসংঘে দুই নেতার কথা হয়। পরে হোয়াইট হাউসের ওভাল অফিসে তাদের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। ট্রাম্প বৈঠকটিকে ‘খুব ভালো’ বলে বর্ণনা করেন। আর লুলা জানান, তিনি বৈঠক শেষে ‘খুব সন্তুষ্ট’।

এ ঘটনা থেকে ধারণা করা হয়, দৃঢ় অবস্থান নেওয়া নেতাদের প্রতি ট্রাম্পের একধরনের শ্রদ্ধা থাকতে পারে।

 

লাতিন আমেরিকায় আধিপত্য বিস্তারের পরিকল্পনা

তাহলে লুলার জয়ে ট্রাম্প অসন্তুষ্ট হওয়ার কারণ কী?
সাম্প্রতিক সময়ে লাতিন আমেরিকার রাজনীতিতে ডানপন্থীদের প্রভাব বেড়েছে। ইকুয়েডর, চিলি, কলম্বিয়া, আর্জেন্টিনা ও পেরুর মতো দেশে ট্রাম্প প্রশাসনের ঘনিষ্ঠ একাধিক নেতা ক্ষমতায় এসেছেন। এই মিত্রদের কাজে লাগিয়ে পশ্চিম গোলার্ধে যুক্তরাষ্ট্রের আধিপত্য প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছেন ট্রাম্প। তার প্রশাসন এ কৌশলকে ‘ডনরো ডকট্রিন’ নামে অভিহিত করেছে।

লাতিন আমেরিকাবিষয়ক গবেষণাপ্রতিষ্ঠান চ্যাথাম হাউসের জ্যেষ্ঠ গবেষক ক্রিস্টোফার সাবাতিনি মনে করেন, প্রথম দফার নির্বাচনে ফ্লাভিও বলসোনারো এগিয়ে যাওয়ার পর ট্রাম্প ভেবেছিলেন, ব্রাজিল হবে তার জন্য ‘দশম ও সবচেয়ে বড় পুরস্কার’।

ব্রাজিল লাতিন আমেরিকার বৃহত্তম অর্থনীতি। ট্রাম্পের ‘শিল্ড অব আমেরিকাস’ জোটে যোগ দিয়ে মাদক পাচারবিরোধী উদ্যোগে অংশ নেবেন- ফ্লাভিও বলসোনারোর ক্ষেত্রে এমন প্রত্যাশাও ছিল।

এছাড়া বিরল মৃত্তিকা খনিজের মজুতের দিক থেকে চীনের পরই বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম মজুত রয়েছে ব্রাজিলে। এসব গুরুত্বপূর্ণ খনিজে অগ্রাধিকারভিত্তিক প্রবেশাধিকার পাওয়ার বিষয়েও যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রহ ছিল।

লুলার জয়ে সেই পরিকল্পনা বাধাগ্রস্ত হয়েছে। তার সামনে এখন আরও চার বছরের মেয়াদ থাকায় ব্রাজিলের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কের ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে হিসাব করতে হবে ওয়াশিংটনকে।

নির্বাচনী ব্যবস্থা ও সামরিক হস্তক্ষেপ নিয়ে বিরোধ
সম্পর্কের উন্নতি হলেও দুই দেশের মধ্যে বিরোধের একাধিক ক্ষেত্র রয়ে গেছে।

চলতি বছরের শুরুতে ব্রাজিল অভিযোগ করে, যুক্তরাষ্ট্র দেশটির নির্বাচনী ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে সন্দেহ তৈরির চেষ্টা করছে। এ ঘটনায় সফরের পরিকল্পনা করা মার্কিন পররাষ্ট্র দফতরের দুই কর্মকর্তাকে ভিসা দিতে অস্বীকৃতি জানায় ব্রাজিল। পাল্টা পদক্ষেপ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র ব্রাজিলের রাষ্ট্রদূতের ভিসা বাতিল করে। ওয়াশিংটন ব্রাজিলের অভিযোগকে ‘ভিত্তিহীন’ বলে প্রত্যাখ্যান করে।

ট্রাম্প যদি ব্রাজিলের নির্বাচনের ফলকে বারবার ‘কারচুপিপূর্ণ’ বলে অভিহিত করতে থাকেন, তাহলে দুই দেশের মধ্যে নতুন করে কূটনৈতিক বিরোধ দেখা দিতে পারে।

এছাড়া লাতিন আমেরিকায় মার্কিন সামরিক পদক্ষেপেরও বিরোধিতা করে আসছেন লুলা। ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে আটক করা থেকে শুরু করে মাদক পাচারের অভিযোগে সন্দেহভাজন নৌযানে বোমা হামলা- এসব পদক্ষেপের সমালোচনা করেছেন তিনি।

ফ্লাভিও বলসোনারোর তদবিরের পর যুক্তরাষ্ট্র ব্রাজিলের দুটি প্রধান অপরাধী চক্রকে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে চিহ্নিত করায়ও ক্ষোভ প্রকাশ করেন লুলা। তার আশঙ্কা, এ ধরনের পদক্ষেপ ব্রাজিলের সার্বভৌমত্বের জন্য হুমকি তৈরি করতে পারে।

লাতিন আমেরিকার বামপন্থী রাজনীতির কাছে বিষয়টি বিশেষভাবে সংবেদনশীল। কারণ, বিংশ শতাব্দীতে এ অঞ্চলে সংঘটিত একাধিক নৃশংস সামরিক স্বৈরশাসনের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএর সংশ্লিষ্টতার ইতিহাস রয়েছে। কমিউনিজম ঠেকানোর যুক্তিতে এসব শাসনকে বিভিন্ন সময়ে সমর্থন দিয়েছিল ওয়াশিংটন।

প্রযুক্তি ও ডিজিটাল অর্থনীতিতেও টানাপোড়েন
যুক্তরাষ্ট্র-ব্রাজিল সম্পর্কে নতুন বিরোধের ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে প্রযুক্তি খাতও।

লুলার নির্বাচনী প্রচারশিবির অভিযোগ করেছিল, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম প্রতিষ্ঠান মেটা ফ্লাভিও বলসোনারোর প্রতি পক্ষপাত দেখাচ্ছে। মেটা এ অভিযোগ অস্বীকার করলেও স্বীকার করে, কনটেন্ট নিয়ন্ত্রণে কিছু সমস্যা ও প্রযুক্তিগত ত্রুটির কারণে কয়েকটি পোস্ট ভুলবশত সরিয়ে ফেলা হয়েছিল কিংবা সেগুলোর প্রচার সীমিত হয়ে পড়েছিল।

এর জবাবে লুলার সমর্থকেরা অ্যালগরিদমের প্রভাব এড়িয়ে তার বার্তা ছড়িয়ে দিতে প্রায় এক কোটি সদস্যের হোয়াটসঅ্যাপ গোষ্ঠী ব্যবহার করেন।

অন্যদিকে, ব্রাজিলের তাৎক্ষণিক অর্থ লেনদেনব্যবস্থা ‘পিক্স’ নিয়েও অসন্তুষ্ট ট্রাম্প প্রশাসন। দেশটির অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা এই ব্যবস্থা দ্রুত ও সহজে অর্থ স্থানান্তরের সুযোগ দেয়। তবে যুক্তরাষ্ট্রের দৃষ্টিতে, পিক্সের বিস্তার ভিসা ও মাস্টারকার্ডের মতো মার্কিন পেমেন্ট প্রতিষ্ঠানের ব্যবসায় প্রতিযোগিতামূলক চাপ তৈরি করছে।

নির্বাচনী প্রচারেও দুই পক্ষের রাজনৈতিক বিভাজন স্পষ্ট হয়ে ওঠে। বলসোনারোর সমর্থকদের সমাবেশে যুক্তরাষ্ট্রের পতাকা ওড়ানো হয়। এমনকি এক সমাবেশে ‘ট্রাম্প, ব্রাজিলে পারমাণবিক হামলা চালাও’ লেখা একটি বেলুনও দেখা যায়। বিপরীতে, লুলা ও তার সমর্থকেরা অভিযোগ করেন, ফ্লাভিও বলসোনারো ব্রাজিলের স্বার্থের চেয়ে যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন।

বাণিজ্যিক সম্পর্কের গুরুত্বও কম নয়
তবে দুই দেশের সম্পর্কের উত্তেজনাকে অতিরঞ্জিত করার সুযোগও রয়েছে। চীনের পর যুক্তরাষ্ট্রই ব্রাজিলের দ্বিতীয় বৃহত্তম বাণিজ্য অংশীদার। ফলে রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকলেও দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্কের গুরুত্ব অস্বীকার করার উপায় নেই।

আপাতত ট্রাম্প ও লুলার মধ্যে কাজ চালিয়ে নেওয়ার মতো সম্পর্ক রয়েছে। তবে তা কত দিন স্থায়ী হবে, তা নির্ভর করবে ব্রাজিলের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র কতটা হস্তক্ষেপের চেষ্টা করে এবং তার জবাবে লুলা কতটা দৃঢ় অবস্থান নেন, তার ওপর।

ব্রাজিলে লুলার প্রত্যাবর্তন তাই শুধু দেশটির অভ্যন্তরীণ রাজনীতির ঘটনা নয়; এটি লাতিন আমেরিকায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব বিস্তারের কৌশল এবং আঞ্চলিক দেশগুলোর সার্বভৌমত্ব রক্ষার আকাঙ্ক্ষার মধ্যকার টানাপোড়েনকেও সামনে এনেছে। সূত্র: বিবিসি