চার বছরে দরিদ্র মানুষ বেড়েছে ৮০ লাখ
দেশে চাল, ডাল, গ্যাস, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার পাশাপাশি অব্যাহতভাবে বাড়ছে বাসাভাড়া ও গণপরিবহনের খরচ। আয়ের বিপরীতে নিত্যপণ্যের দাম আকাশচুম্বী হওয়ায় চরম বিপাকে পড়েছেন স্বল্প আয়ের সাধারণ ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত মানুষ। দেশের বর্তমান বাজার পরিস্থিতিতে গত চার বছরে নতুন করে প্রায় ৮০ লাখ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে গেছেন।
বিবিসি বাংলার প্রতিবেদন ও বিশ্বব্যাংক প্রকাশিত ‘বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট আপডেট’ রিপোর্ট পর্যালোচনা করে এ তথ্য উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে জানানো হয়, গত চার বছরের ব্যবধানে নতুন করে দরিদ্র হওয়া ৮০ লাখ মানুষের মধ্যে কেবল গত এক বছরেই প্রায় ২১ লাখ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে চলে গেছেন।
এ ছাড়াও দেশে বর্তমানে নিম্ন-মধ্যবিত্ত শ্রেণিতে অবস্থানরত আরও প্রায় ৬ কোটি ২০ লাখ মানুষ দরিদ্র হওয়ার ঝুঁকির মধ্যে রয়েছেন। এর ফলে দেশে বর্তমানে দরিদ্র মানুষের সংখ্যা ৩ কোটি ৫০ লাখ ছাড়িয়ে গেছে বলে প্রাক্কলন করেছে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস)।
রাজধানীর মগবাজার এলাকার বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা আতিকুর রহমান নিজের অভিজ্ঞতার কথা জানিয়ে বলেন, “সবকিছুর খরচ এত বেড়েছে যে বেতনের টাকায় মাস পার হচ্ছে না। আগের কিছু সঞ্চয় ছিল, সেটাও এখন প্রায় শেষের দিকে। জিনিসপত্রের দাম এভাবে বাড়তে থাকলে সংসার কীভাবে চালাবো আর ছেলেমেয়ের পড়াশোনার খরচ কীভাবে দেব, ভেবে কূল-কিনারা পাচ্ছি না।”
বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, কোভিড মহামারি, জ্বালানি সংকট, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, দুর্বল বিনিয়োগ, রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং কর ও ভর্তুকি পদ্ধতির কাঠামোগত দুর্বলতার কারণে দেশে দ্রুত দারিদ্র্য বেড়েছে। ২০২২ সালে অতিদারিদ্র্যের হার যেখানে ৫.৬ শতাংশ ছিল, ২০২৫ সালে তা বেড়ে ১০.১ শতাংশে পৌঁছেছে। একই সময়ে জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার কমে ৩.৪ শতাংশে নামার পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে।
গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন জানান, করোনা মহামারির সময় কর্মসংস্থান হারিয়ে বহু মানুষ বেকার হন, যা পরবর্তীতে সুশাসন ও ব্যাংকিং খাতের অনিয়ম-লুটপাটের কারণে আর পুনরুদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। পরবর্তীতে ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির জটিলতায় নতুন বিনিয়োগ থমকে যায়, যা কর্মসংস্থান সংকুচিত করেছে।
একই সঙ্গে বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, দেশে বিদ্যমান সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির সুবিধা প্রকৃত গরিবদের তুলনায় ধনীরা বেশি পাচ্ছেন। নিম্ন আয়ের ২০ শতাংশ দরিদ্র মানুষ বছরে গড়ে ৭ হাজার ১৪০ টাকার সহায়তা পান, যার বিপরীতে শীর্ষ ২০ শতাংশ ধনী ব্যক্তি পান ১০ হাজার ৪৭২ টাকা সমপরিমাণ সুবিধা।
তবে বর্তমানে বিএনপি সরকারের প্রবর্তিত ‘ফ্যামিলি কার্ড’ কর্মসূচি যদি প্রকৃত সুবিধাভোগীদের হাতে সুনির্দিষ্টভাবে পৌঁছানো যায়, তবে প্রতি বছর সাড়ে ২৮ লাখ মানুষ দারিদ্র্য থেকে মুক্তি পেতে পারে বলে মত দিয়েছে বিশ্বব্যাংক।
সার্বিক অর্থনৈতিক সংকটের বিষয়ে প্রধান মন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা বিষয়ক উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেন, বিদ্যমান অর্থনৈতিক সমস্যা, উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও ব্যাংকিং খাতের সংকটগুলো মূলত পূর্ববর্তী সরকারের সময় থেকে উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত এবং কিছু বৈশ্বিক বাহ্যিক সংকটের ফল। সরকার বর্তমানে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও সামষ্টিক অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা ফেরাতে সর্বোচ্চ চেষ্টা চালাচ্ছে।




















